নারী ও শিশু নির্যাতনরোধে ইসলামের ভুমিকা

500x350_4d8d3da0d5d3beb6f0dd972e56b71ab1_islam45

ইসলাম : ইসলাম বিশ্বমানবতার মূর্তপ্রতীক। মানবতার কল্যাণ সাধনেই যার আবির্ভাব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সত্যদ্বীনসহ রাসূল প্রেরণ করেছেন ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের জন্য। তাই কুরআন ও হাদিসের সব আলোচনা মানুষকেন্দ্রিক। সব সমম্যায় ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। বর্তমান সময়ে আলোচিত বড় সমস্যা হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন। যা মহামারী আকার ধারণ করেছে। কুরআন ও হাদিসে নারীর মর্যাদা ও শিশু অধিকারে এসেছে অসংখ্য নির্দেশনা। জাগো নিউজে যার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশসহ বিশ্ব মিডিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অহরহ ঘটে চলেছে নারী ও শিশুর প্রতি অমানুষিক নির্যাতন। অথচ ইসলাম নারী ও শিশুকে দিয়েছে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান। মা, স্ত্রী, বোন ও কন্যার পরিচয়ে সংরক্ষণ করেছে সব অধিকার।

নারীর মর্যাদা
নারীরা একে অপরের সাহায্যকারী বন্ধু হওয়া, সৎকর্মশীল হওয়া, অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা, বার্ষিক হজ পালন, যাকাত প্রদানসহ ইত্যাদি সামাজিক কর্মকাণ্ডই পুরুষের মতো মহিলাদের ওপরও বাধ্যতামূলক। এর মাধ্যমে তারা তাদের মধ্যে নৈতিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি করতে পারে এবং খোদামুখী আধ্যাত্মিক চেতনা গড়ে তুলতে পারে। পবিত্র কুরআনে এ কথাটি এভাবে বলা হয়েছে- يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَن لَّا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعْهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থাৎ হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু। (সূরা মুমতাহিনা : আয়াত ১২)

মায়ের মর্যাদায় নারী-
নারীকে মায়ের মর্যাদা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ অর্থাৎ আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।
মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে জনৈক সাহাবী জানতে চান কে সবচেয়ে উত্তম আচরণ পাওয়ার অধিকারী। সাহাবীর প্রশ্নের উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার জবাব দিলেন “তোমার মা”। সাহাবী ৪র্থবারের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন “তোমার পিতা” (বুখারি)।

স্ত্রীর মর্যাদায় নারী-
নারীকে স্ত্রী মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে ইসলাম। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُواْ شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
তোমারা তোমাদের স্ত্রীদের সাথে ন্যায়সংগতভাবে জীবন-যাপন কর। অতপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন। (সূরা নিসা : আয়াত ১৯)
এছাড়াও শিশুর মর্যাদা ও অধিকার প্রদানে ইসলামে রয়েছে অনন্য বক্তব্য। কন্যা শিশুর মর্যাদা ও সম্মান প্রদানে আল্লাহর রাসুল অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। শিশু ফাতিমাকে অনেক ভালবাসতেন তিনি। তাইতো তিনি বলেন, ‘শিশুদেরকে ভালোবাস, শিশুরা আল্লাহর পুষ্প। (তিরমিজি) মহান আল্লাহ বলেন “তোমারা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করনা। তাদেরও তোমাদের রিযিক আমিই ব্যবস্থা করি। (সূরা ইসরা ও সূরা আল ইমরান)

শিশু হত্যা রোধ ও শিশু জীবনের নিরাপত্তাদান-
চরম বর্বরতার যুগ আইয়্যামে জাহেলিয়াতে মানুষ যে কারণে শিশুসন্তান হত্যা করতো তা হলো- ১) কন্যা সন্তান হলে পিতা-মাতাকে লজ্জার সম্মুখীন হতে হয় এ চিন্তায়, ২) সন্তানদের লালন-পালনে অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ার ভয়ে, ৩) নিজেদের উপাস্যদের সন্তুষ্টির জন্য সন্তানদের বলি দেয়া হতো।
আল্লাহ বলেন, وَكَذَلِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٍ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ قَتْلَ أَوْلاَدِهِمْ شُرَكَآؤُهُمْ لِيُرْدُوهُمْ وَلِيَلْبِسُواْ عَلَيْهِمْ دِينَهُمْ وَلَوْ شَاء اللّهُ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ
এমনিভাবে অনেক মুশরেকের দৃষ্টিতে তাদের উপাস্যরা সন্তান হত্যাকে সুশোভিত করে দিয়েছে যেন তারা তাদেরকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তাদের ধর্মমতকে তাদের কাছে বিভ্রান্ত করে দেয়। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না। অতএব, আপনি তাদেরকে এবং তাদের মনগড়া বুলিকে পরিত্যাগ করুন। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৩৭)
قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ قَتَلُواْ أَوْلاَدَهُمْ سَفَهًا بِغَيْرِ عِلْمٍ وَحَرَّمُواْ مَا رَزَقَهُمُ اللّهُ افْتِرَاء عَلَى اللّهِ قَدْ ضَلُّواْ وَمَا كَانُواْ مُهْتَدِينَ অর্থাৎ নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা নিজ সন্তানদেরকে নির্বুদ্ধিতাবশত কোনো প্রমাণ ছাড়াই হত্যা করেছে এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব দিয়েছিলেন, সেগুলোকে আল্লাহর প্রতি ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে হারাম করে নিয়েছে। নিশ্চিতই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সুপথগামী হয়নি। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৪০)

قُلْ تَعَالَوْاْ أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلاَ تَقْتُلُواْ أَوْلاَدَكُم مِّنْ إمْلاَقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلاَ تَقْرَبُواْ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلاَ تَقْتُلُواْ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ অর্থাৎ আপনি বলুন! এসো, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশিদার করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ১৫১)

আসুন, গোলাপ পাপড়ির সৌরভ ছড়ানো, হাসনাহেনার সুগন্ধি বিলোনো নিষ্পাপ নিষ্কলুষ ছোট্ট সোনা-মনিদের নির্যাতিত প্রতিচ্ছবি যেন সমাজে দেখা না যায়। কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সমাজের নারী ও শিশুদের প্রতি যত্নবান হই। এ নারী ও শিশুরাই যেন হয়ে ওঠে সুন্দর, স্বপ্নীল ও ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের দক্ষ কারিগর। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।

মন্তব্য করুনঃ